ইউরােপের সামন্ততান্ত্রিক অর্থনীতিতে ম্যানর প্রথার প্রধাণ বৈশিষ্ট্য

উচ্চ মাধ্যমিক একাদশ শ্রেণীর ইতিহাস পঞ্চম অধ্যায় ‘অর্থনীতির বিভিন্ন দিক’ থেকে ইউরােপের সামন্ততান্ত্রিক অর্থনীতিতে ম্যানর প্রথার প্রধাণ বৈশিষ্ট্য গুলি আলোচনা কর।

ইউরােপের সামন্ততান্ত্রিক অর্থনীতিতে ম্যানর প্রথার প্রধাণ বৈশিষ্ট্য

প্রশ্ন:- ইউরােপের সামন্ততান্ত্রিক অর্থনীতিতে ম্যানর প্রথার প্রধাণ বৈশিষ্ট্য গুলি উল্লেখ কর।

সূচনা :- মধ্যযুগের সামন্ততান্ত্রিক কাঠামােয় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ছিল ম্যানর ব্যবস্থা বা সিনেরীয় ব্যবস্থা।সামন্ততান্ত্রিক অর্থনৈতিক উৎপাদন ব্যবস্থায় ম্যানর প্রথা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

ম্যানর ব্যবস্থা

ইউরোপের বেশিরভাগ মানুষ গ্রামে বসবাস করত। এই রকম এক বা একাধিক গ্রাম নিয়ে গড়ে উঠত ‘ম্যানর’। গ্রামে সামন্তপ্রভুর অধীনস্থ জমি চাষ করার জন্য ইউরােপে যে ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল তাকে ম্যানর ব্যবস্থা বলা হত।

ম্যানর-ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য

মধ্যযুগের ইউরােপে গড়ে-ওঠা ম্যানর-ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি ছিল নিম্নরূপ। –

(১) ম্যানর হাউস

প্রতিটি ম্যানর অঞ্চলে ম্যানর প্রভুর খামার বাড়ি অর্থাৎ ম্যানর হাউস থাকত। এটি ছিল সামন্তপ্রভুদের স্থানীয় প্রশাসনিক কেন্দ্র। ম্যানর হাউসে খাওয়ার ঘর, শােওয়ার ঘর, উপাসনার ঘর, ভৃত্যদের ঘর, ঘােড়ার আস্তাবল প্রভৃতি সবকিছুই থাকত।

(২) ম্যানর-প্রভুর আধিপত্য

ম্যানর ব্যবস্থায় একজন প্রভুর অধীনে ম্যানর এলাকায় একটি অনুগত মানবগোষ্ঠী বসবাস করত। এদের ওপর ম্যানর-প্রভু চূড়ান্ত আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে।

(৩) অর্থনৈতিক দিক

ম্যানরে সামন্তপ্রভুর অধীনে কৃষক ও ভূমিদাসরা উৎপাদন কার্যে অংশ নিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখত। তবে এখানকার অর্থনীতি ছিল একেবারেই অঞ্চলভিত্তিক।

(৪) জমির চরিত্র

প্রতিটি ম্যানরের যে বিপুল পরিমাণ জমি ছিল তার মধ্যে ছিল চাষের জমি, পশুচারণ ভূমি, জলাভূমি, পতিত জমি, জঙ্গল।এছাড়া ছিল কৃষকের গৃহ, গির্জা এবং শ্রমিক ও কারিগরদের বাসগৃহ। এখানে মূলত দুপ্রকার জমি ছিল ডিমিন বা প্রভুর খাস জমি এবং কৃষকের বসতি, আবাদি ও পশুচারণ জমি।

(৫) জমির বন্টন

সামন্তপ্রভু তাঁর নিজের দখলে রাখা জমিতে কৃষকও ভূমিদাস বা সার্ফদের বেগার খাটিয়ে ফসল উৎপাদন করতেন।অবশিষ্ট জমি ম্যানরে বসবাসকারী ১২-৬০ টি কৃষক পরিবারের মধ্যে বণ্টিত হত। প্রভুকে বার্ষিক বিভিন্ন ধরনের কর ও বেগার শ্রম দিয়ে তারা এই জমি ভােগ করতে পারত।

(৬) উৎপাদন ব্যবস্থা

ম্যানরের জমিতে প্রথমদিকে বছরে দুটি এবং পরে তিনটি চাষ হত। উৎপাদন হত মূলত গ্রামের প্রয়ােজনের ওপর ভিত্তি করেই।অনুন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে উৎপাদন কম হত।

(৭) রাষ্ট্রের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ

ম্যানরগুলি ছিল রাষ্ট্রের একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ। এর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ম্যানর হাউস-এ প্রভু বসবাস করতেন। এখান থেকে প্রভু ম্যানরে বসবাসকারী তার অধীনস্থ প্রজাদের ওপর শাসন ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতেন। ম্যানর অঞ্চলে প্রভুর ক্ষমতাই ছিল চূড়ান্ত।

(৮) স্বয়ংসম্পূর্ণতা

প্রতিটি ম্যানর ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ। বিভিন্ন পেশার মানুষ যেমন ম্যানরে বাস করত এবং তারা ম্যানরের যাবতীয় প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করত।তাই নিত্য প্রয়ােজনীয় সামগ্রীও ম্যানরেই পাওয়া যেত। ম্যানরের প্রয়ােজনমতােই এখানকার যাবতীয় উৎপাদন কার্য চলত।

উপসংহার :- মধ্যযুগের ইউরােপে প্রচলিত সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিশেষ ধরনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামাে গড়ে উঠেছিল। এই কাঠামাের প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল ভূস্বামীর খামার বাড়ি, দুর্গ এবং গির্জা। সামন্তপ্রভুরা শিকার, যুদ্ধ ও অন্যান্য আনন্দ করে দিন যাপন করত।আর সমগ্র দেশের জন্য প্রয়ােজনীয় কৃষি উৎপাদন সম্পন্ন করত ম্যানরের কৃষকরা।

Leave a Comment