উচ্চ মাধ্যমিক একাদশ শ্রেণীর ইতিহাস পঞ্চম অধ্যায় ‘অর্থনীতির বিভিন্ন দিক’ থেকে রোমে ক্রীতদাস ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো ও ক্রীতদাসের জীবন যাত্রার বিবরণ দাও।
রোমে ক্রীতদাস ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য ও ক্রীতদাসের জীবন যাত্রার বিবরণ
প্রশ্ন:- রোমে ক্রীতদাস ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো। ক্রীতদাসের জীবন যাত্রার বিবরণ দাও।
ভূমিকা :- প্রাচীনকালে বিভিন্ন দেশের সমাজ ব্যবস্থায় কোনো প্রভুর মালিকাধীনে কোনো কোনো ব্যক্তির বসবাস করা ও বেঁচে থাকার প্রথা চালু ছিল। প্রভুর অধীনস্থ সেই সকল ব্যক্তি দাস বা ক্রীতদাস নামে পরিচিত ছিল। প্রভু তার অধীনস্থ ক্রীতদাসকে দিয়ে বিভিন্ন পরিশ্রমসাধ্য কাজ করিয়ে ক্রীতদাসের শ্রমের মূল্য নিজে উপভোগ করত। এই প্রথা অনুযায়ী প্রভু ইচ্ছা করলে তার ব্যক্তিগত সম্পদ ক্রীতদাসদের বিক্রি বা হত্যা করতে পারত। অধীনস্ত দাসের ওপর তার প্রভুর এই সার্বিক মালিকানা দাস প্রথা বা ক্রীতদাস প্রথা নামে পরিচিত ছিল।
রোমে ক্রীতদাস ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য
প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের ক্রীতদাস প্রথার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন –
(১) ক্রীতদাস সৃষ্টি
রোমের অধিকাংশ ক্রীতদাস ছিল পরাজিত শত্রুপক্ষের যুদ্ধবন্দী।দরিদ্র ও ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিদের মহাজন ক্রীতদাসে পরিণত করত।এছাড়া ক্রীতদাসদের অনেক সন্তান-সন্ততি জন্মসূত্রে ক্রীতদাসে পরিণত হতো।
(২) অধিকার ও স্বাধীনতা বিহীন
রোমের ক্রীতদাসরা রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনে সম্পূর্ণরূপে পরাধীন ছিল।তারা কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় আইনের সুবিধা ও নাগরিক অধিকার পেতনা।
(৩) কাজকর্ম
ক্রীতদাসরা তাদের প্রভুর গৃহ, খামারবাড়ি, কৃষিক্ষেত্র, ব্যবসা ইত্যাদি দেখাশোনা সহ যাবতীয় পরিশ্রমসাধ্য কাজগুলি সম্পাদন করত।ক্রীতদাসদের শ্রমেই রোমের বিশালাকার প্রাসাদ, রাস্তাঘাট, সেতু,পয়ঃপ্রণালী প্রভৃতির নির্মাণ কাজ চলতো।
(৪) প্রভুর সম্পত্তি
রোমের ক্রীতদাস এবং তাদের সন্তান-সন্ততি ছিল প্রভুর ব্যক্তিগত সম্পত্তি। প্রভু তার অধীনস্থ ক্রীতদাসকে অন্যত্র ভাড়া খাটাতে, বিক্রি করতে এমনকি হত্যা করতেও পারত।
(৫) শাস্তি
দুর্বিষহ জীবন থেকে মুক্তি পেতে ক্রীতদাসরা পালানোর চেষ্টা করলে তাদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চলত। চাবুকের আঘাত, উত্তপ্ত লোহার ছেঁকা প্রভৃতি নির্দয় অত্যাচার ছিল ক্রীতদাসদের কাছে সাধারণ বিষয়।
(৪) ব্যবহার
প্রভুর নিজের ইচ্ছামতো ক্রীতদাসদের ব্যবহার করার অধিকার ক্রীতদাস ব্যবস্থার আরেকটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। যেমন সুন্দরী দাসীদের যৌন কাজে ব্যবহার ও সুষ্ঠু পরিশ্রমী দাসদের কঠিন পরিশ্রমের কাজে ব্যবহার করা।
(৬) ক্রয়-বিক্রয়
ক্রীতদাস ব্যবস্থার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্যহল দাস ক্রয়বিক্রয়। মিশর, মেসোপটেমিয়া, রোম প্রভৃতি দেশে ক্রীতদাস জন্য বিক্রয় হত মূলত সমাজে দাস প্রথার ফলে মালিক শ্রেণির সুখ-স্বাচ্ছ্যন্দ ও ব্যবসার উন্নতি ঘটানোর উদ্দেশ্যে।
রোমের ক্রীতদাসদের জীবনযাত্রা
প্রভুর বিভিন্ন ধরনের অমানবিক আচরণ, নির্যাতন, লাঞ্ছনা প্রভৃতির ফলে ক্রীতদাসদের জীবন ছিল সীমাহীন দুঃখ দুর্দশায় পূর্ণ। যেমন –
(১) শারীরিক নির্যাতন
এটি ছিল ক্রীতদাসদের জীবন যাত্রার একটি অন্যতম উপাদান। সমস্ত ক্রীতদাসদের সর্বদাকোনো কাজের ত্রুটি ও প্রভুর অধীনে থাকার নমুনা স্বরূপ চরম শারীরিক নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হত। বেত্রাঘাত, অনাহার প্রভৃতি ছিল এর এক একটি অঙ্গ। প্লেটোর একটি নাটকের একটি দৃশ্যে, বোলিও নামে এক প্রভু তীব্র চিৎকার করতে করতে তার ক্রীতদাসকে চাবুক দিয়ে পেটাচ্ছে।
(৩) পালানোর চেষ্টায় শাস্তি
ক্রীতদাসরা চরম অত্যাচারের হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে মাঝে মাঝে পালানোর চেষ্টা করত। ধরা পড়া ক্রীতদাসদের কপালে F চিহ্ন দিয়ে মালিক শ্রেণি তাদের চিহ্নিত করে রাখত। এই ক্রীতদাসদের দেশের কোনো আইনি অধিকার দেওয়া হত না। পালিয়ে যাওয়া ক্রীতদাস ধরা পড়লে বেত্রাঘাত, গরম লোহার ছ্যাঁকা প্রভৃতি দেওয়া হত। যে সমস্ত ক্রীতদাস পালিয়ে যেত তাদেরকে ‘ম্যানুমিসিও’ বলা হত।
(৪) অমানবিকতা
প্রভু তার অধীনস্ত ক্রীতদাসের ওপর সর্বদা চরম অত্যাচার করত। যার ফলে ক্রীতদাসদের গায়ে সারা বছর কালো দাগ হয়ে থাকত। প্রভুরা সর্বদা ক্রীতদাসদের ওপর নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণ করত। উদাহরণ স্বরূপ একদা একটি কাপ ভাঙার শাস্তি হিসাবে প্ৰভু ভেডিয়াস পোলিও তার অধীনস্ত ক্রীতদাসটিকে মাছের খাদ্য হিসাবে জীবন্ত অবস্থায় জলাশয়ে ছুঁড়ে ফেলার আদেশ দিয়েছিলেন।
(৫) গ্ল্যাডিয়েটর লড়াই
রোমের মানুষের অবসর বিনোদনের একটি মাধ্যম ছিল গ্ল্যাডিয়েটরের লড়াই। এই লড়াইয়ে সাধারণত কোনো ক্রীতদাসকে একটি খোলা মাঠে কোনো বাঘ, সিংহ বা অন্য কোনো হিংস্র ও ক্ষুধার্ত পশুর সঙ্গে অসম লড়াইয়ে অংশ নিতে হত। এই লড়াইয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্রীতদাসটি প্রাণ হারাত। রোমের মানুষ এই দৃশ্য আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করত।
(৬) প্রভুর সুব্যবহার
ঐতিহাসিক নার্দো বলেছেন যে, “কোনো কোনো প্রভু নিজের সন্তানের মতোই তাদের দাসদের প্রতি অত্যন্ত যত্নশীল ছিলেন।” ইতিহাসবিদ এল. পি. উইলকিনসন বলেছেন যে, “কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্রীতদাসরা রোমের দরিদ্র সাধারণ মানুষের চেয়েও ভালো খাওয়া পরা পেত।”
(৭) সতুরনালিয়া উৎসব
কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রভু ও তার অধীনস্থ ক্রীতদাসদের মধ্যে সহমর্মিতার প্রকাশ ঘটতো সতুরনালিয়া নামে এক উৎসবের মাধ্যমে। এই উৎসবে প্রভু ক্রীতদাসের ভূমিকা গ্রহণ করত এবং ক্রীতদাস তার প্রভুর ভূমিকা পালন করত।
উপসংহার :- দুর্বিষহ জীবন থেকে মুক্তি পেতে ক্রীতদাসরা বিদ্রোহ করার উদ্দেশ্যে মাঝেমধ্যে ঐক্যবদ্ধ হত। গ্রীক ইতিহাসবিদ ডায়োডোরাস তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রীতদাস বিদ্রোহের উল্লেখ করেছেন। শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন রোমান সম্রাট ক্রীতদাসদের কিছু কিছু অধিকারের স্বীকৃতি দেন।